“সড়ক নির্মানে অংশ নিয়ে নি:স্ব থেকে সংসারে স্বচছলতা আনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত’’
মোছা: মরতুজা বেগম এর বসবাস হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার হাওর পরিবেষ্টিত সদর ইউনিয়নের হাসামপুর গ্রামে। বর্ষাকালে প্রায় ৬ মাস গ্রামটি মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। বর্তমানে ৪২ বছর বয়সী মরতুজা বেগম এর বড় মেয়ে (১৫ বছর) ও ছোট মেয়ে ( ১২বছর)। ২০১২ সালে দিনমজুর স্বামী আব্দুস সহিদ তাকে ও তার দুটি মেয়েকে পরিত্যাগ করে অন্য একটি বিয়ে করে অন্যত্র বসবাস শুরু করে। স্বামীর এমনভাবে চলে যাওয়াতে ছোট দুটি বাচ্চাকে নিয়ে মরতুজা বেগম অথৈ সাগরে পড়ে যায়। কোন উপায় না পেয়ে ছোট ভাইয়ের আশ্রয়ে চলে আসে। স্বামী থাকাকালীন সে কখনও অন্যের বাড়িতে কাজ করেনি। স্বামীর চলে যাওয়ার পর ছোট বাচ্চাদের খাবার যোগান দিতে সে প্রতিবেশীদের বাড়িতে কাজ শুরু করে। তিনবেলা খাবার অনেক সময় জুটতো না। মরতুজা বেগম এর কাছের এমন কেউ নেই যে তাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করবে।
সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে মরতুজা বেগম কাজের সন্ধান করতে থাকে এবং জীবন বাচাঁর তাগিদে দিনমজুর হিসাবে যখন যে কাজ পান, তা করেন। ঠিক এসময়ে হিলিপ প্রকল্পের অবকাঠামো উন্নয়ন অঙ্গের আওতায় বস্নকরোড তৈরীর জন্য শ্রমিকচুক্তি পদ্ধতির (এলসিএস) আওতায় নির্মান শ্রমিকদের সংগঠন গড়ে তোলা হয়। ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে এলজিইডি কর্তৃক বাসত্মবায়িত হিলিপ প্রকল্পের আওতায় আজমিরীগঞ্জ উপজেলার কমিউনিটি রাস্তার কাজ ( উজানপাড়া কবরস্থান - বাশঁহাটিয়া রোড চেইনেজ ০০-১০০০ মিটার ) সদর ইউনিয়নে শুরু হলে মরতুজা বেগম হিলিপ প্রকল্প স্টাফ এলসিএস অর্গানাইজার (সংকর কুমার) এর সহায়তায় এলসিএস সদস্য হিসেবে (চেইনেজ ৩০০-৪৫০ মিটার) কাজের জন্য ৩ নং এলসিএস গ্রুপের সদস্য নির্বাচিত হয়। এরপর প্রকল্পের অধীনে এলসিএস সদস্যের কমিউনিটি রাসত্মার কাজের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ গ্রহন করে রাস্তার কাজ শুরু করেন। দুই দিনের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি রাস্তার কাজের পাশাপাশি পারিবারিক আইন, পুষ্টি, নিরাপদ পনি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, টিকা, জেন্ডার ইত্যাদি সম্বন্ধে জানতে পারেন। এলসিএস সদস্য হিসেবে ঐ রাস্তার কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে সে দৈনিক ২৫০/- টাকা করে পারিশ্রমিক পেত।তিনি উক্ত সড়কে ৩ মাস ১০ দিন কাজ করে হিলিপ প্রকল্প হতে মোট ২৫০০০/- পারিশ্রমিক গ্রহন করেন ।
নিজস্ব কর্মসংস্থানের মাধ্যমে মরতুজা বেগমের কর্মময় জীবন শুরু হয় এলসিএস এ যুক্ত হয়ে রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসাবে কাজ করার জন্য সে প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। এর মাধ্যমে সরকারী কাজে যোগদান করার পর হতে ঘরের বাহিরে দিনমজুরের কাজে তার পরিচিতি বেড়ে যাওয়ায় কাজ পেতে কিছু সফলতার মুখ দেখে সে। প্রতি মাসে সে দিনমজুরী করে মাসিক প্রায় ৬০০০/- টাকা থেকে ৮০০০/- টাকা আয় করে। সময় পেলে মাঝে মাঝে সে অন্যের বাড়িতে গৃহস্থলীর কাজ করে পেটে ভাতে। শীতকালে হাওরে ধান কাটার মৌসুমে ধান কাটা হয়ে যাওয়ার পর জমিতে ধানের অবশিষ্টাংশ যা পড়ে থাকে রহিমা তার বাচ্চাদের নিয়ে মাঠে যায় সেগুলো কুড়াতে। এভাবে সে প্রায় ১ মাস ধরে হাওরের জমি থেকে ধান সংগ্রহ করে যা দিয়ে সে তার পরিবারের প্রায় ২-৩ মাসের চালের যোগান করে থাকে। মরতুজা বেগম তার এবং তার মেয়েদের জন্য বছরে একবার নতুন কাপড় কিনতে পারেন।
এর আগে মরতুজা বেগম কখনই অন্যের বাড়ীতে কাজ করে দৈনিক ৫০/- টাকার বেশি পারিশ্রমিক হিসেবে আয় করতে পারেনি। পুরুষদের পাশাপাশি সমানভাবে কাজ করে দৈনিক ২৫০/- হতে ৩০০/- টাকা মজুরী পাওয়াতে প্রতিদিনের খরচ চালিয়ে সময়ের ব্যবধানে সে তার সংসারে স্বচছলতার মুখ দেখতে শুরু করে।
হিলিপ প্রকল্পের আওতায় গ্রামীন সড়ক ফেরীঘাট- বাশহাটিয়া নির্মান কাজ শেষ করার পর মরতুজা বেগম মোট ৩,০০০/- লভ্যাংশ হিসেবে পান। সে লভ্যাংশ দিয়ে একটি গর্ভবতী ভেড়া কিনেন। দেড় বছর পরে তিনটি বাচ্চাসহ বিক্রি করে ১০,০০০/- টাকাসহ হাতে জমানো টাকা দিয়ে ২৫০০০/- টাকায় একটি গাভী কিনেন। পরবর্তী ২ বছর পর গাভীটির প্রথম বাচ্চা ২৭,০০০/-বিক্রি করেন। বর্তমানে মা গাভীটির দাম ৬০,০০০/- এবং গাভীটির আরেকটি বাছুর রয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন ২ লিটার দুধ বিক্রি করেন।
গ্রামীন সড়কসহ যেকোন কাজে দিনমজুরী করে মরতুজা বেগম মোট সঞ্চয়ের গ্রামীন বিমা ডিভিশন এপর্যন্ত ৪ বছরে মাসিক কিস্তিতে ২৭,২০০/- টাকা জমা করেছেন। মেয়ে বিয়ে দেওয়ার জন্য সোনালী ব্যাংকে ৩২,৫০০/ জমা রেখেছেন । ২০১২ সালে মরতুজা বেগম এর স্বামী দুই মেয়েকে ফেলে নতুন বিয়ে করে অন্যত্র চলে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে সে ছোটভাইয়ের বাড়ী আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে ছোট ভাইয়ের দেয়া জায়গায় (৩ শতাংশ) নিজ অর্জিত ৭৫,০০০/- টাকা দিয়ে টিনেরবাড়ী তুলে দুই মেয়ে নিয়ে থাকেন।দুই মেয়ের জন্য ১০,০০০/- টাকা দিয়ে দুইজোড়া কানের দুল ও রুপার পায়েল ২০০০/- টাকায় কিনেছেন। নিজের জন্য একটি নাকফুল কিনেছেন( ১০০০/-)।
হিলিপ প্রকল্পের এলসিএস এর কাজ শেষ করার পর পরিচিতি বেড়ে যাওয়ায় সে এলজিইডি’সহ পৌরসভার যখন যে কাজ চলে ,তাকে অংশগ্রহনের সুযোগ দেয়া হয়। সে তার নিকটবর্তী প্রতিবেশী দুই অসহায় মহিলাকে (সাকিরন বিবি ও সুফিয়া আক্তার) দিনমজুর হিসাবে কাজ পেতে প্রয়োজনীয় সহায়তা করে থাকেন। দিনমজুরী কাজে ব্যস্ততার ফাঁকে সবজিচাষও করে থাকেন।
মরতুজা বেগম এর ইচ্ছে আছে তার মেয়ে দুটোকে লেখাপড়া শেখাবে যাতে করে ভবিষ্যতে কিছু কর্ম করে খেতে পারে, তার মতো কষ্টের জীবন যেন তাদের না হয়। রহিমা অনেক খুশি তার জীবনে এলজিইডি কর্তৃক বাস্তবায়িত হিলিপ প্রকল্প থেকে জীবনের প্রথম ঘরের বাহিরে দিনমজুর হিসাবে এমন কাজ করার সুযোগ পেয়ে। আর্থিক স্বচছলতার পাশাপাশি মরতুজা বেগম এর আত্নবিশ্বাসও এখন বেড়ে গেছে। আগে মরতুজা বেগম যেখানে পুরুষ শাষিত সমাজে কথা বলতে ভয় পেত এখন সে যেকোন গ্রাম্য শালিসে অনেকের সাথে অংশগ্রহন করতে পারে, মতামত দিতে পারে। মরতুজা বেগম এখন সচেতন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে নারীর অংশগ্রহন, নারীর অধিকার সম্পর্কে, মরতুজা বেগম এখন স্বপ্ন দেখে একটি সুন্দর সুখী ভবিষ্যতের।
তথ্যসংগ্রহকারীর এক প্রশ্নের জবাবে মরতুজা বেগম বলেন,‘‘আফা, আমি অনেক কষ্টে আজ ছয় বছর একাই সংসারের বোঝা টানছি। নিজ চেষ্টায় মাথা গুজার একটা ঠাই করে নিছি। অনেক কষ্টে এটুক আসতে পারছি। এখন কেউ আমারে আমার জামাই নিয়া প্রশ্ন করলে আমি সোজা বলে দিই , আমার জামাই মইরা গেছে।" সত্যিই মনে কতটা কষ্ট জমলে এমনটা বলতে পারে.........!
পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, এটুআই, বিসিসি, ডিওআইসিটি ও বেসিস